Blog

আমার জাগ্রত দেবতা

স্বামী সত্যশিবানন্দ

(“আমার চোখে শ্রীমৎ স্বামী গৌরানন্দ” বই থেকে)

আমি শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমংসদেবকে দেখিনি, শ্রীশ্রী মা সারদাকে দেখিনি, শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেবকেও দেখিনি, কিন্তু যাঁকে দেখে আমার ঘরছাড়া এবং যাঁর দৃষ্টিতে এই সমস্ত দেবতাদের অন্বেষণ; তিনি আমার জাগ্রত দেবতা ও গুরুদেব পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী গৌরানন্দজী মহারাজ। শতবর্ষের আলোকে যিনি উদ্ভাসিত, তীব্র ত্যাগ, তিতিক্ষা যাঁর ভূষণ, রাঢ়বঙ্গের অগণিত ভক্তের যিনি আশ্রয়স্থল; সেই মহান সন্ন্যাসী, আমার গুরুদেব বর্তমান বরাহনগর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমের সংঘপিতাকে আমার আভূমি সাষ্টাঙ্গ প্রণতি।

সাল ১৯৯৫; পণ্ডিতপুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমের শীর্ষসেবক স্বামী সাক্ষানন্দের কাছে গেছি গুরুর সন্ধানে। গর্ভধারিণী মা বললেন, কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়ার জন্য। আমি মাকে বললাম; দীক্ষা নেব একজন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর কাছে। সে যাই হোক, স্বামী সাক্ষানন্দ মহারাজ একটি হাতচিঠি লিখে দিলেন তাঁরই অগ্রজ স্বামী গৌরানন্দজী মহারাজকে। চিঠির ভাষা আজও আমার মনে আছে; “শ্রদ্ধেয় গৌরীদা, আমার প্রণাম নেবেন। আশুকে আপনার কাছে পাঠালাম, শিক্ষিত, ভালো ছেলে; ঠাকুর, মা, স্বামীজীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা; ও দীক্ষা নিতে চায়, ব্যবস্থা করে দেবেন।” চিঠি খানা গুরুদেব পড়লেন এবং কি নাম, কি করো, বাড়িতে কে কে আছে, কেন দীক্ষা নিতে চাও ইত্যাদি নানান প্রশ্ন করলেন। শেষে বললেন অন্য একদিন এসো। প্রণাম করে ফিরে এলাম। আবার কিছু দিন পরে গেলাম। গুরুদেব বললেন সামনে ফলহারিণী কালীপূজা, খুব ভালো দিন, চলে এসো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সঙ্গে কি নিয়ে আসতে হবে এবং দীক্ষার নিয়ম-কানুন কি? গুরুদেব বললেন, তুমি তো এখনো ছাত্র, পড়াশোনা করছো, তুমি গ্রামের পুকুর থেকে কিছু পদ্মফুল ও একটি হরিতকী নিয়ে আসবে। আমার আনন্দের সীমা নেই। যথারীতি শুভদিনে, শুভক্ষণে আমার দীক্ষা হয়ে গেল, এবং জয়দেব শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমে আমার নিয়মিত যাওয়া আসা শুরু হোল।

তখন জয়দেব রামকৃষ্ণ আশ্রম এতটা চাকচিক্য ছিলনা, তিনজন সাধু, গুরুদেব, ব্রহ্মচারী অমিত চৈতন্য এবং তুলসী মহারাজ। গুরুদেব বললেন, একাদশীর দিন আসার চেষ্টা করবে। আমি যাবার চেষ্টা করতাম; একাদশীর দিন সারারাত নাম গান হতো, শ্রীধর মাস্টার, পাঁচু দা, গদাই দা, তুলসী দা, ডাক্তার বাবু সহ আরও অনেক ভক্ত আসতেন নাম করতে। আমরা রাত বারোটার পর পালা করে বিশ্রাম নিতে গেলেও গুরুদেবকে নিতে দেখিনি। সারারাত ধরে নাম করতেন, জপ করতেন আবার মাঝে মাঝে শ্রীখোলও বাজাতেন। এখনকার মতো এত ভোগের আড়ম্বর ছিলনা; রাতে মোটা মোটা রুটি, সবজি গুরুদেব জিজ্ঞাসা করতেন, সবাই প্রসাদ পেয়েছি কিনা।

জয়দেব মেলার সময় বলতেন, আশ্রমের জন্য মাধুকরী করতে; সেই মতো আমি এবং আমার গুরুতুল্য অমর মহারাজ, বন্ধু দামোদর, কালিপদ দা, গৌসাই দা সবাই মিলে গ্রামে চাল সংগ্রহ করে জয়দেব আশ্রমে নিয়ে যেতাম। পেছনের মাঠটা সবাই মিলে পরিষ্কার করতাম। বন্যার সময় বাম মহারাজের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে খিচুড়ি রান্না করে খাওয়ানোর কাজে সাহায্য করতাম। গুরুদেব খুব খুশিই হতেন।

তারপর ধীরে ধীরে গৃহত্যাগ করে আশ্রমবাসী হবার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। মনের ইচ্ছা গুরুদেবকে ও দুবরাজপুর আশ্রমের শীর্ষসেবক ব্রহ্মচারী নিত্যচৈতন্য মহারাজকে জানালাম। সালটা ২০০০; শ্রীঠাকুর সত্যানন্দের আবির্ভাব উৎসবের দিন বরাহনগর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমে গুরু মহারাজ আমাকে ব্রহ্মচর্য ব্রতে দীক্ষা দিলেন। নাম হল ব্রহ্মচারী সনৎ চৈতন্য। আমার সঙ্গে অমর মহারাজেরও ব্রহ্মচর্য হয়েছিল। আমার ইচ্ছা ছিল গুরুদেবের কাছে থেকে গুরুদেবের সাহায্য করা এবং গুরুকে সেবা করা। কিন্তু তিনি আমাকে প্রথমেই পাণ্ডিতপুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমে পাঠিয়ে দিলেন এবং বললেন, মাঝে মাঝে জয়দেব আশ্রমে যেও।

“শাস্ত্রে পড়েছি সাধু কাকে বলে! যাঁর মন প্রাণ ঈশ্বরে গত, হরি কথা ছাড়া যিনি অন্য কথা বলেন না, যাঁকে দেখলে ঈশ্বরের উদ্দীপন হয় তিনিই সাধু। দিনের পর দিন গুরুদেবের সঙ্গ করে দেখেছি সাধু-সঙ্গের ফল; সাধু সাজা না, সাধু হওয়া। বাসস্থানের কোন চাকচিক্য নেই, সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবন, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সারাজীবন একটি আটপৌরে কাঠের তক্তার উপর দুটি কম্বল, একটি বালিশ ও মশারি টাঙিয়ে দিব্যরাত্রি অবস্থান। তপস্যা, শুধুই তপস্যা। ‘তপসা চীয়তে ইতি ব্রহ্ম’। আমাদের বলতেন; দিনে ঘুমাবে না। ভালো ভালো খাবার থেকে মনটাকে সরাও; একাদশীর দিন সারারাত জেগে নাম জপ করবে। সাধুজীবনে বিলাসিতাকে একদম ঠাঁই দেবে না। প্রতিদিন গীতা, শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত, শ্রবণমঙ্গলম্ পড়বে। এই সময় বেশি করে তপস্যা করো, আর আশ্রমের কাজ করো। এর মধ্যে আমি পণ্ডিতপুর থেকে দুবরাজপুর আশ্রমে চলে এসেছি সত্যেন মহারাজের সহযোগী হিসাবে। কিন্তু এখানকার কর্মজীবনে আমি ক্লান্ত হয়ে আবার একদিন দুম করে গুরুমহারাজকে গিয়ে বললাম, গুরুদেব আমাকে এমন একটা আশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দিন, যেখানে আমি একান্তে তপস্যা করার সুযোগ পাবো। গুরুদেব প্রথমে বললেন, দুবরাজপুর একটা বড়ো আশ্রম, সেখান থেকে তুমি চলে এলে সত্যেন মহারাজের অসুবিধা হবে। আমি কিন্তু নাছোড়, শেষে তিনি বললেন, ঝাড়খণ্ডের মধুপুরে আমাদের একটি আশ্রম আছে। ঠাকুর সত্যানন্দদেবের তপস্যার জায়গা। তবে সেখানে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই, মাধুকরী করে খেতে হবে। আমি সেখানে দীর্ঘদিন ছিলাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। গুরুদেব কলকাতায় মধুমহারাজকে (স্বামী সারদানানন্দ) ফোন করলেন। মধু মহারাজ বললেন, ওকে সন্ন্যাস দিয়ে মধুপুরে পাঠান; আমার তখন মাত্র পাঁচবছর ব্রহ্মচারী জীবন। যথারীতি ২০০৫ সালে ভগবান শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমংশদেবের আবির্ভাব তিথিতে আমার সন্ন্যাস হলো, এবং তিনি নাম দিলেন স্বামী সত্যশিবানন্দ। তার কয়েকদিন পর গুরুদেব নিজে আমাকে মধুপুরে আশ্রমে রেখে এলেন।

ওঃ, কী ভালোবাসা! গুরুদেবের আশীর্বাদ স্নেহ-ভালোবাসা, আমার নতুন সন্ন্যাস-জীবনকে এক নতুন পর্বের দিশা দেখায়। মধুপুরে আশ্রমে আমি যাবার আগে, গুরুদেব কাউকে না জানিয়ে মধুপুরে আশ্রম ঘুরে এসে বরাহগরে আমাকে বললেন, আমি ঘুরে এলাম মধুপুর। দেখ বাবা, কোন কিছুই নেই, শুধু বাড়ি টুকুই আছে, তুমি থাকতে পারবে তো? হ্যাঁ গুরুদেব, আমি থাকতে পারবো। আমি সাধু হয়েছি, ভিক্ষায় তো আমার জীবন; আপনার আশীর্বাদ আছে; ঠাকুর আছেন। গুরুদেব নিজে তার পরের দিন (২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০০৫) সকালের ট্রেনে আমাকে নিয়ে মধুপুর আশ্রমে পৌঁছান। যথারীতি মালিরা ঘর খুলে দিল। গুরুদেব এবং আমি দুজনেই কুয়োর জলে স্নান করে ঠাকুর ঘরে গেলাম। গুরুদেব ঠাকুরের পুজো করলেন এবং আমি কথামৃত পাঠ করলাম। পুজো শেষে গুরুশিষ্য দুজনেই জল চিনি মুড়ি খেলাম। তারপর তিনি বললেন, দেখো রান্নার কিছু আছে কিনা। দেখলাম সামান্য চাল,অল্প মুসুর ডাল ও কয়েকটা আলু পড়ে আছে। আর বাগান থেকে পুনর্নবা শাক তুলে আনলাম। আমি রান্না করলাম, দুজনেই প্রসাদ পেলাম। বিকেলে গুরুদেব আমাকে স্থানীয় কপিল মঠ ও বিবেকানন্দ মঠে নিয়ে গেলেন পরিচয় করানোর জন্য। কপিল মঠের মহারাজ স্বামী ভাস্কর অরণ্য গুরুদেবের পূর্ব পরিচিতি। গুরুদেব তাঁকে বললেন, এই ছেলেটি এখন থেকেই আমাদের আশ্রমে থাকবে, একটু দেখবেন। ঐ দিন রাত্রে গুরুদেব আমাকে আমার চলার পথে অনেক কথা বললেন। বললেন “ভয় পেওনা, একা থাকবে, বেশি করে ঠাকুরকে ডাকবে, বেশি করে জপ, ধ্যান করবে এবং বুক নিংড়ে ঠাকুরকে ডাকবে। ঠাকুর সত্যানন্দ এখানে বহুবার এসেছেন, তপস্যা করেছেন, মায়ের দর্শন পেয়েছেন, গোপালের পদচিহ্ন পড়েছে। ঠিকমতো সাধুজীবন যাপন করতে পারলে ঠাকুরের কৃপা অনুভব করতে পারবে”। গুরুদেবের আশীর্বাদ ব্যর্থ হয়নি, মর্মে মর্মে শ্রীঠাকুরের উপস্থিতি আমি অনুভব করতাম।

প্রথম ছয়মাস মধুপুর জীবন আমার কাছে মোটেই সুখকর ছিল না। অজানা-অচেনা পরিবেশ, কোন ভক্তই শিষ্য নেই। খাবারের কোন ঠিকানা নেই। হঠাৎ গুরুদেবের ফোন পেলাম। তিনি আমাকে ১১ই ডিসেম্বর, ২০০৫, জয়দেব আসতে বললেন। আমি এলাম। আমার কাছে লোকাল ট্রেনের ভাড়টুকুুই অবশিষ্ট ছিল, ফিরব কিভাবে? গুরুদেবকে বলতেও পারছি না যে, কিছু টাকা পয়সা দিন। অন্তর্যামী গুরুমহারাজ আমাকে বললেন, দুবরাজপুর আশ্রমে গোপালজী এসেছেন, প্রণাম করে রাতে থেকে পরের দিন চলে যেও। আমি প্রণাম করে ফিরে আসছি—গুরুদেব আমার হাতে ৩০০ টাকা দিয়ে বললেন, “রাখো, কাজে লাগবে”। আমার চোখে জল ভরে এলো। এরপর থেকে আমাকে দুটো খাবারের জন্য কোনদিন ভাবতে হয়নি।

মধুপুর আশ্রমটি ছিল গুরুদেবের খুব ভালোবাসার জায়গা। আমি মধুপুর আশ্রমে থাকাকালীন তিনি বহুবার গেছেন, দীক্ষা দিয়েছেন এবং এখানকার ভক্তদের বারবার বলতেন—এটি তোমাদের গুরুগৃহ, আশ্রমটি রক্ষা করার দায়িত্ব তোমাদের সকলের। মধুপুর আশ্রমে একদিন বিকেলবেলায় গুরু-শিষ্য পুরোনো ঠাকুর ঘরের টিনের বারান্দায় বসে আছি। গুরুদেব আপনমনেই তাঁর মধুপুর আশ্রমে থাকার কথা বলতে লাগলেন, “আমি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এখানে ছিলাম, ঠাকুর মন্দিরের ভিতর আসন পেতে পশ্চিমদিকের দরজায় মুখ করে বসলেন। আর আমি বাগানে ঠাকুরের দিকে মুখ করে বসলাম। দুজনেই দুজন কে দেখছি। ঠাকুর আমার দিকে চেয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন। আমি তাঁর জ্যোতির্ময় রূপ দর্শন করে ভাবে বিভোর হয়ে গেলাম। মধুপুরে আমি বেশির ভাগ সময় জপধ্যান করেই কাটাতাম—দু-একদিন রান্না করতাম, বেশির ভাগ সময় লাল চা খেয়েই কাটিয়ে দিতাম। তার ফলে আমার গ্যাস্ট্রিক আলসার হয়ে গেল। ঠাকুর আমাকে কলকাতা নিয়ে গেলেন, চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুললেন। খুব বকলেন, বললেন—শরীরটাই যদি ঠিক না থাকে কাকে নিয়ে তপস্যা করবি? অনেক অনিয়ম করেছো, ডাক্তারকে সব খুলে বলবে। সুস্থ হলে ঠাকুর আমাকে জয়দেব আশ্রমে পাঠিয়ে দিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত জয়দেবে আছি।”

শৈশবে মাতৃহীন হওয়াতে গুরুদেবরা তিন ভাই তিন জায়গায় ছিটকে গিয়েছিলেন। গুরুদেব বাতিকার গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে মানুষ হন। তারপর তাঁর বয়স যখন ১২ বছর তখন শ্রীঠাকুর সত্যানন্দদেবের সংস্পর্শে আসেন। বর্তমান আমজোড়া আশ্রমের পাশেই একতালা গ্রামে গুরুদেবের পূর্বাশ্রম। আমজোড়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন ম্যাট্রিক পর্যন্ত। আমজোড়া আশ্রম থেকে সিউড়ি আশ্রমে রোজ ঠাকুরের জন্য গুরুদেব দুধ নিয়ে যেতেন। শৈশব থেকেই ঠাকুরের কৃপাদৃষ্টি ছিল গুরুদেবের প্রতি। ব্রহ্মচর্য্যের পর ঠাকুর তাঁর নাম রাখলেন গৌরীচৈতন্য এবং সন্ন্যাসের পর নাম হল স্বামী গৌরানন্দ। গুরুর আদেশ ও নির্দেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন, এবং এখনো করে চলেছেন। রাতে তিনটের পর ঘুম থেকে উঠে স্নান করে জপ-ধ্যানে বসা আজও অব্যাহত। সারারাত জেগে দুর্গাপুজোর জাগপ্রদীপ রক্ষা করা থেকে আশ্রমের প্রতিটি কঠিন কাজ গুরুদেব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। বিলাসিতা, পদ, অর্থমোহ গুরুদেবকে কোনদিন স্পর্শ করতে পারেনি।

স্বামী সত্যশরণানন্দের তিরোধানের পর বরাহনগর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমে তিনি সংঘপিতার আসনে অভিষিক্ত হন। প্রত্যেকটি আশ্রমে খোঁজ-খবর রাখা, ভক্ত/শিষ্যদের খোঁজ-খবর রাখা তাঁর নিত্য অভ্যাস। জয়দেব আশ্রমে একবার বৈশাখ মাসে দুপুরে রোদে সাল আনুমানিক ২০০৪-০৫ পঞ্চতপা করেছিলেন। অমর মহারাজ, সঞ্জয় মহারাজ, জপেনদা ও আমি বসেছিলাম। সুনীল মহারাজ (স্বামী মাধবানন্দ) আসার পর আজকে জয়দেব রামকৃষ্ণ আশ্রম একটি নতুন রূপ পেয়েছে। সাড়ম্বরে রামনবমীতে গুরুদেবের জন্মদিন পালন, সারা বৈশাখ মাসে হরিনাম সংকীর্তন, গোশালা, স্বামী ভূপানন্দ শিশু বিদ্যানিকেতন, মোবাইল মেডিকেল পরিষেবা, দাতব্য চিকিৎসালয়, জয়দেব মেলায় প্রসাদ বিতরণ, কম্বলদান, বস্ত্রদান কতকী হয়েছে। শতবর্ষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গুরুদেব আজ ভক্তদের কৃপাবর্ষণ করে যাচ্ছেন। প্রকৃত সন্ন্যাসীর জীবনে যে মায়ার কোন স্থান নেই, সেটি দেখেছি যখন তাঁর চোখের সামনে তাঁর থেকে বয়সে ছোট সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসীদের অকাল প্রয়াণে। এই কিছুদিন আগে তাঁর ছোটো ভাই ভাস্করদার মৃত্যু সংবাদ রাত তিনটের সময় সুনীল মহারাজ আমাকে ফোনে দেয়। গুরুদেব সেদিন দুবরাজপুরে ছিলেন। আমি ভাবছি এত রাতে কি করে গুরুদেবকে এই সংবাদ দেব। রাত চারটের সময় গুরুদেবের ঘরে গিয়ে বললাম, সুনীল ফোন করেছিল ভাস্করদার শরীর ভালো নেই, আপনাকে জয়দেব যেতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে গুরুদেব বললেন, না, ভাস্কর রাত তিনটের সময় মারা গেছে। অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, কি করে উনি বুঝতে পারলেন, যে ভাস্করদা মারা গেছে। যাই হোক, গুরুদেবকে জয়দেব নিয়ে গেলাম। বেলাতে সব আত্মীয় আসতে লাগল। সবাই কান্নাকাটি করছে, গুরুদেব নির্বিকার। বর্তমানে গুরুদেবকে সুস্বরাখার দায়িত্ব নিয়েছেন ড. বিপ্লব ঘোষ, ড. সুপ্রিয় ব্যানার্জী, ড. দিবেন্দু সিনহা, ড. শ্যামা প্রসাদ মিশ্র, সমীরণ মণ্ডল সহ অনেকেই। আমরা সবাই তাঁর সুস্থ, দীর্ঘ জীবন প্রার্থনা করছি ঠাকুরের কাছে। তিনি যতদিন দেহে থাকবেন ততদিন সংঘের কল্যাণ, ভক্তদের কল্যাণ। তিনি আমাদের শত অপরাধ ক্ষমা করে কৃপাবর্ষণ করে যাচ্ছেন। আমরা সবাই সৌভাগ্যবান যে তাঁর মতো একজন তপসিদ্ধ মহান তাপসের কাছে আশ্রয় পেয়েছি। প্রণাম, শত কোটি আভূমি প্রণাম শ্রীগুরুর রাতুলচরণে।

হরি ওঁ রামকৃষ্ণ; হরি ওঁ সত্যানন্দ।

“পরীক্ষা লীলার ভেতরেই, আবার যতক্ষণ কাঁচাভক্তি ততক্ষনই পরীক্ষা আর লীলা আলাদা বোধ হয়, কিন্তু পাকাভক্তি হলে তখন সব লীলা।” —শ্রীঠাকুর সত্যানন্দ

ঠাকুর সত্যানন্দ কালচারাল সোসাইটি

ঠাকুর সত্যানন্দ কালচারাল সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য হল সঠিক শিক্ষা, সঠিক পথ, সঠিক মূল্যবোধ প্রদানের মাধ্যমে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ঘটানো এবং একটি ধর্মীয়, সহানুভূতিশীল, সুস্থ এবং শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *